নীরা : এক অদৃশ্য ফ্রিকোয়েন্সি
সিজন ১ | এপিসোড ২ | ৩১২ নং কেবিন
প্রথম পর্বের পরে......
এইদিকে আমি জানি না এখনো কোথাও যাবো?
প্রায় রাত ১২:৪৫ এর দিকে আবার মেসেজ এল—
“তুমি কি আজ হাসপাতালে আসবে?
৩১২ নম্বর কেবিন।
আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।”
ঠিকানাটা ছিল শহরের এক জীর্ণ প্রান্তে।
হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমবার দ্বিধা করলাম।
রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা।
বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু বাতাসে এখনো ভেজা গন্ধ।
স্ট্রিটলাইটের আলো পানিতে প্রতিফলিত হয়ে কাঁপছে।
হাসপাতালের গেটটা আধখোলা।
ভেতরে অন্ধকার পুরো না—কিন্তু পুরো আলোও না।
যেন জায়গাটা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না—জেগে থাকবে, না ঘুমাবে।
আমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলাম।
ফোনটা হাতে।
স্ক্রিন অন।
শেষ মেসেজ—
তুমি কি আজ হাসপাতালে আসবে?
৩১২ নম্বর কেবিন।
আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।”
ফোনটা পকেটে রেখে
আমি চারপাশে তাকালাম।
কেউ নেই।
হালকা একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।
কিন্তু সেটা ভয় না।
বরং এমন একটা অনুভূতি—
যেন আমি এমন কোথাও যাচ্ছি, যেখানে আমার যাওয়া উচিত না…
কিন্তু আমাকে যেতেই হবে।
হাসপাতালের গেটটা ঠেলে ঢোকার সময়ই আমার মনে হয়েছিল—আমি ভুল করছি।
কিন্তু তখন আর পেছনে ফেরার মতো অবস্থা ছিল না।
আমি গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।
হাসপাতালটার গেট দিয়ে ঢুকতেই এক কটু গন্ধ আমাকে অভ্যর্থনা জানাল-
পুরোনো ঔষধ,
ফিনাইল আর স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের এক মিশ্রণ।
করিডোরগুলো দিয়ে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল বাতাস জমে আছে।
রিসেপশনের দিকে এগোলাম।
টিউবলাইট জ্বলছে।
কিন্তু আলো স্থির না।
মাঝে মাঝে ফ্লিকার করছে।
কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কেউ নেই।
“হ্যালো?” আমি ডাকলাম।
কোনো উত্তর নেই।
দূরে করিডোরের ভেতর থেকে একটা শব্দ এল।
ধীরে…
ধাতব কিছু ঠেলার শব্দ।
আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম।
একটা ট্রলি।
সাদা কাপড় ঢাকা।
কেউ ঠেলছে।
কিন্তু…
পুরো দেখা যাচ্ছে না।
আলো আর ছায়ার মাঝে শরীরটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে।
যেন সে পুরোপুরি এখানে নেই।
আমি আবার সামনে তাকালাম।
এইবার কাউন্টারের পেছনে একজন দাঁড়িয়ে।
আমি নিশ্চিত—এক সেকেন্ড আগেও কেউ ছিল না।
“জি?” সে বলল।
তার কণ্ঠ স্বাভাবিক।
কিন্তু চোখ…
চোখদুটো আমার দিকে না।
আমার পাশ দিয়ে কোথাও তাকিয়ে আছে।
আমি গলা পরিষ্কার করলাম।
“আমি রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,“নীরা নামে কোনো রোগী কি এখানে ভর্তি আছেন?
৩১২ নম্বর কেবিন?”
সে আমাকে থামিয়ে দিল।
চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল—
“আপনি দেরি করে ফেলেছেন।”
আমার বুকের ভেতর হালকা চাপ পড়ল।
“মানে?” আমি বললাম।
সে এবার সরাসরি আমার দিকে তাকাল।
“সে অপেক্ষা করত।”
এই “করত” শব্দটা মাথায় ঠুকল।
“এখন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে একটু থামল।
তিনি ধীর গলায় বললেন—“এই নামে এখানে এখন কেউ নেই।
তবে মাসখানেক আগে একজন নীরা ছিল ৩১২ নম্বর কেবিনে।
সে মারা গেছে।
তার শেষ সময়টাতেও কেউ তাকে দেখতে আসেনি। লাশটা যখন মর্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল,
তখনো তার হাতে একটা ফোন শক্ত করে ধরা ছিল।
আমার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
মারা গেছে?
তাহলে প্রতিদিন আমার সাথে কথা বলছে কে?
ঠিক তখনই ফোনের ভাইব্রেশন।
মেসেজ:“তুমি কি আজ আসবে?
আমি কিন্তু এখনো ৩১২ নম্বর রুমেই আছি।”
আমি বুঝতে পারছিলাম,
আমার এইখান থেকে এই মুহূর্তে চলে যাওয়া দরকার।
কিন্তু তা না করে
বরং জিজ্ঞেস করলাম—
“ওর রুমটা কোথায় ছিল?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে একটা কাগজ টেনে নিল।
কলম দিয়ে লিখল—
৩১২
কাগজটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।
“লিফট কাজ করে না,” সে বলল।
“সিঁড়ি দিয়ে যান।”
আমি কাগজটা নিলাম।
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে ছিল।
অন্ধকার সিঁড়ি
সিঁড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি খেয়াল করলাম—
হাসপাতালের ভেতরের শব্দগুলো কমে যাচ্ছে।
প্রথম ফ্লোর—
লোকজনের হালকা আওয়াজ।
দূরে কথা।
দ্বিতীয় ফ্লোর—
শব্দ কম।
দরজা বন্ধ।
তৃতীয় ফ্লোরে পা দিতেই—
নীরবতা।
পুরো এমন নীরবতা…
যেখানে নিজের শ্বাসও বেশি জোরে শোনা যায়।
আমি থেমে গেলাম।
পেছনে তাকালাম।
সিঁড়ি নিচে অন্ধকার।
কেউ নেই।
আমি আবার সামনে তাকালাম।
করিডোর লম্বা।
দেয়ালে টিউবলাইট -
একটা জ্বলছে।
একটা নিভে।
একটা জ্বলছে।
একটা নিভে।
আলো আর অন্ধকারের ফাঁকে ফাঁকে পথটা এগিয়ে গেছে।
আমি হাঁটতে শুরু করলাম।
৩১০…
৩১১…
তারপর—
৩১২
দরজাটা পুরো বন্ধ না।
আধখোলা।
ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই।
কেবিনের সামনে
আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।
হাত তুললাম।
ধীরে ঠেলে দিলাম।
দরজাটা কেঁচ করে খুলল।
যেনো বহুদিন খোলা হয় নি এই দরজা।
রুমটা—খালি!
একটা বেড।
একটা স্যালাইন স্ট্যান্ড!
একটা চেয়ার।
জানালার পর্দা অর্ধেক ছেঁড়া।
কিন্তু…
রুমটা “খালি” মনে হচ্ছিল না।
এইটাই সমস্যা।
কারণ খালি জায়গা হালকা লাগে।
এখানে—
চাপা।
যেন কেউ একটু আগেই ছিল।
অথবা…
এখনো আছে।
আমি ধীরে ভেতরে ঢুকলাম।
পায়ের নিচে হালকা শব্দ হলো।
আমি নিচে তাকালাম।
মেঝেতে হালকা একটা দাগ।
একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার দাগ।
দীর্ঘ সময়।
অপেক্ষা যখন ভয়ের দ্বারপ্রান্তে
আমি ফোনটা বের করলাম।
স্ক্রিন অন।
চ্যাট ওপেন।
শেষ মেসেজ—
“তুমি কি আজ আসবে?”
আমি টাইপ করলাম—
“আমি এসেছি।”
Send
Seen.......
বুক ধক করে উঠল।
Typing…
ঠিক তখনই—
পেছনে একটা শব্দ।
চেয়ারের।
ধীরে ঘষা খাওয়ার শব্দ।
আমি ঘুরে তাকালাম।
চেয়ারটা…
আগের জায়গায় নেই।
একটু সরে গেছে।
উত্তর
ফোন কাঁপল।
মেসেজ—
“আমি জানি।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
আমি ধীরে বললাম—
“তুমি কোথায়?”
Typing…
থামল।
আবার typing…
“তুমি ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে আছ…”
“আমি সেখানেই ছিলাম।”
অনেক বছর।
আজ আমি মুক্ত
আমার পা নড়ল না।
আমি নিচের দিকে তাকালাম।
মেঝের দাগটা।
হঠাৎ মনে হলো—
ওটা দাগ না।
ওটা একটা সীমা।
যেখানে সে দাঁড়াত।
প্রতিফলন
আমি ধীরে মাথা ঘুরালাম।
কেউ নেই।
কিন্তু—
জানালার কাঁচে…
আমার প্রতিফলন।
আর…
আমার পেছনে—
কেউ দাঁড়িয়ে।
পুরো স্পষ্ট না।
কিন্তু মাথা নিচু।
চুল ভেজা।
স্থির।
আমার ঠিক পেছনে।
আমি নড়তে পারছিলাম না।
ফোনে মেসেজ এল—
“তুমি দেরি করেছ।”
“আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
“একাই।”
স্পর্শ
হঠাৎ—
আমার কাঁধে কিছু একটা স্পর্শ করল।
খুব হালকা।
কিন্তু পুরো শরীর জমে গেল।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
শ্বাস নিতে পারছিলাম না।
তারপর—
একটা ফিসফিস—
“এবার তুমি এসেছ…”
“এবার আমি একা না…”
আলো নিভে যাওয়া
হঠাৎ টিউবলাইটটা ফ্লিকার করতে শুরু করল।
জ্বলছে—
নিভছে—
জ্বলছে—
নিভছে—
প্রতিবার আলো নিভলে—
মনে হচ্ছিল সে একটু কাছে আসছে।
আর যখন আলো জ্বলছে—
সে আবার দূরে।
কিন্তু পুরো অদৃশ্য না।
শেষবার—
আলো নিভল।
কিছুক্ষণ জ্বলল না।
পুরো অন্ধকার।
আমি দাঁড়িয়ে।
শ্বাস আটকে।
তারপর—
আলো জ্বলে উঠল।
রুম খালি।
পুরো খালি।
বের হতে চাওয়া
আমি আর থাকতে পারছিলাম না।
দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
এক পা…
দুই পা…
তিন পা.....
ধপ...
দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
আমি থেমে গেলাম।
হাত দিয়ে দরজা ঠেললাম।
খুলল না।
অভিযোগ
ফোন কাঁপল।
“তুমি সবসময় চলে যাও।”
আমি দরজায় ধাক্কা দিলাম।
“কে তুমি?!”
আমি চিৎকার করলাম।
নীরবতা।
তারপর…
খুব আস্তে…
আমার ডান পাশে।
কানের কাছে।
শ্বাসের মতো না।
গরম না।
ঠান্ডা না।
একটা উপস্থিতি।
আর একটা কণ্ঠ—
“আজ যেও না…”
আমি দৌড়ে বের হয়ে এলাম।
করিডোরে কেউ নেই।
সিঁড়ি দিয়ে নামলাম।
নিচে রিসেপশন।
কাউন্টারের পেছনে কেউ নেই।
আমি থামলাম না।
গেট দিয়ে বের হয়ে এলাম।
বাইরে বাতাস ঠান্ডা।
বাস্তব।
স্বাভাবিক।
আমি হাঁটতে লাগলাম।
দ্রুত।
কোথায় যাচ্ছি—
সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
পা নিজে নিজেই চলছিল।
ফোনটা কাঁপল।
আমি থামলাম।
স্ক্রিন অন করলাম।
নতুন মেসেজ।
“তুমি চলে গেলে…”
কিছুক্ষণ পর আরেকটা—
“কিন্তু আমি তো এখন জানি তুমি কোথায় থাকো।”
আমি ধীরে মাথা তুললাম।
দূরে হাসপাতালের বিল্ডিং।
তৃতীয় তলার একটা জানালায়—
একটা ছায়া।
রাস্তার বাতিগুলো ভেজা অ্যাসফল্টে লম্বা হয়ে পড়ে আছে।
মাঝে মাঝে কোনো গাড়ি পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, হেডলাইটের আলো এসে
সবকিছু কয়েক সেকেন্ডের জন্য পরিষ্কার করে দিচ্ছে—
তারপর আবার অন্ধকার।
আমার ফোনটা এখনো হাতে।
স্ক্রিন নিভে আছে।
কিন্তু মনে হচ্ছিল—ওটা নিভে নেই।
ভেতরে কিছু চলছে।
আমি হঠাৎ থেমে গেলাম।
কোনো কারণ ছাড়াই।
পেছনে তাকালাম।
রাস্তা ফাঁকা।
কেউ নেই।
তবুও মনে হচ্ছিল—
আমি একা না।
আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম।
এইবার একটু দ্রুত।
তারপর আরও দ্রুত।
শেষে প্রায় দৌড়।
চলবে... তৃতীয় পর্বের জন্য ক্লিক করুন
