নীরা: অদৃশ্য হাহাকার | সিজন ১ | এপিসোড ৩ : এবার তুমি একা না

 নীরা : অদৃশ্য হাহাকার

সিজন ১ | এপিসোড ৩ |

এবার তুমি একা না


রুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে লক করলাম।

দুইবার চেক করলাম।

হাত দিয়ে ঠেলে দেখলাম।

বন্ধ।

ঘরটা আগের মতোই।

খাট।

টেবিল।

ফ্যান।

দেয়ালের দাগ।

সব একই।

কিন্তু…

কিছু একটা আলাদা লাগছিল।

আমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলাম।

শুনতে চেষ্টা করলাম।

ফ্যান ঘুরছে।

ঘড়ঘড় শব্দ।

তার মাঝে—

একটা বিরতি।

তারপর আবার ঘোরা।

আমি ধীরে বললাম—

“এটা আগেও ছিল…”

কিন্তু আজ…

শব্দটা যেন একটু অন্যরকম।

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

নিজেকে বললাম—

“আজকে অনেক কিছু হয়েছে।”

“এটা স্বাভাবিক।”

ফোনটা টেবিলে রাখলাম।

বাথরুমে গেলাম।

মুখে পানি দিলাম।

আয়নায় তাকালাম।

নিজেকে স্বাভাবিক লাগছিল না।

চোখের নিচে কালি।

মুখে ক্লান্তি।

কিন্তু এর চেয়েও অদ্ভুত—

মনে হচ্ছিল…

আমি একা দাঁড়িয়ে নেই।

আমি হঠাৎ ঘুরে তাকালাম।

কেউ নেই।

আবার আয়নায় তাকালাম।

এইবার আমি দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলাম।

কারণ আমি নিশ্চিত না ছিলাম—

দ্বিতীয়বার তাকালে কী দেখব।


আবার মেসেজ

ওয়াসরুম থেকে রুমে ফিরে এলাম।

লাইট অফ করলাম না।

আজকে না।

বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিলাম।

স্ক্রিন অন।

চ্যাট ওপেন।

পুরো চ্যাট হিস্ট্রি…

নেই।

খালি।

শুধু একটা মেসেজ।

“আমি এখন তোমার কাছেই আছি।”

আমার বুক ধক করে উঠল।

আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

এই মেসেজটা নতুন।

টাইমস্ট্যাম্প—এইমাত্র।

আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

আমি দ্রুত টাইপ করলাম—

“তুমি কী চাও?”

Send।

Seen।

Typing…

থেমে গেল।

আবার typing…

“তুমি তো নিজেই এসেছিলে।”

আমি দাঁত চেপে ধরলাম।

“তুমি কে?”

এইবার রিপ্লাই আসতে সময় লাগল না।

“তুমি আমাকে দেখেছ।”

আমার গলা শুকিয়ে গেল।

আমি লিখলাম—

“না।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর—

“মিথ্যা বলো না।”


শব্দ

ঠিক তখন—

দরজার কাছে একটা শব্দ।

খুব হালকা।

যেন কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে…

হাত রাখল দরজার ওপর।

আমি জমে গেলাম।

শ্বাস আটকে গেল।

আরেকটা শব্দ।

এইবার একটু স্পষ্ট।

টক।

একটা নক।

খুব আস্তে।

আমি কিছু বললাম না।

নড়লাম না।

ফোন কাঁপল।

“দরজাটা খুলে দাও।”

আমার হাত কাঁপছিল।

আমি টাইপ করলাম—

“তুমি বাইরে?”

Seen।

“আমি তো ভেতরেই আছি।”

আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

আমি ধীরে দরজার দিকে তাকালাম।

দরজার নিচ দিয়ে—

ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে।

অস্বাভাবিক ঠান্ডা।


ফ্যান

ফ্যানটা হঠাৎ থেমে গেল।

পুরো।

রুম নিস্তব্ধ।

তারপর—

খুব ধীরে…

ফ্যানটা আবার ঘোরা শুরু করল।

কিন্তু এবার—

উল্টো দিকে।

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

“এটা সম্ভব না…” আমি ফিসফিস করে বললাম।

ফোনে মেসেজ—

“তুমি এখন খেয়াল করছ।”

ক।

এইবার একটু জোরে।

ঠক.....

ঠক......

আমার পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে।

আমি ধীরে দরজার দিকে এগোলাম।

প্রতিটা পা ভারী।

হাত বাড়ালাম।

লক খুললাম।

ধীরে দরজা খুললাম।

করিডোর—

ফাঁকা।

কেউ নেই।

লাইট জ্বলছে।

সব স্বাভাবিক।

আমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলাম।

তারপর দরজা বন্ধ করতে গেলাম—

হঠাৎ মনে হলো—

করিডোরের একদম শেষে…

কেউ দাঁড়িয়ে।

আমি তাকালাম।

কেউ নেই।


কাগজ

সকালে দরজা খুলতেই আমি থেমে গেলাম।

দরজার সামনে একটা কাগজ।

ভাঁজ করা।

আমি ধীরে তুলে নিলাম।

খুললাম।

লেখা—

“তুমি যাকে খুঁজেছিলে, সে আমি ছিলাম না।”

আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।

ভাবলাম যাক বাচা গেলো, এইবার মনে হয় এই অশরীরীর হাত থেকে বাচা গেলো!

কিন্তু 

আমি কাগজটা উল্টালাম।

পেছনে লেখা --আমি শুধু তোমাকে খুঁজছিলাম।”


বাস্তবের ফাটল

আমি সেদিন অফিসে গিয়েছিলাম।

সবকিছু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছি।

কাজ করেছি।

কথা বলেছি।

হেসেছি।

কিন্তু মাঝে মাঝে—

শব্দ থেমে যাচ্ছিল।

সব কিছু কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ।

তারপর আবার ফিরে আসছে।

একবার কম্পিউটার স্ক্রিনে নিজের রিফ্লেকশন দেখলাম।

আমার পেছনে…

কিছু একটা নড়ল।

আমি ঘুরে তাকালাম।

কেউ নেই।


ফিরে আসা

রাতে রুমে ফিরলাম।

দরজা বন্ধ করলাম।

লাইট অন।

সব ঠিক।

কিছুক্ষণ পর—

ফোন কাঁপল।

মেসেজ—

“আজ তুমি আমাকে দেখোনি।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

ধীরে শ্বাস নিলাম।

লিখলাম—

“আমি তোমাকে দেখতে চাই না।”

Seen।

Typing…

“কিন্তু তুমি তো দেখছ।”

ঠিক তখন—

আমার পেছনে…

খাটে চাপ পড়ার শব্দ।

যেন কেউ বসেছে।

ধীরে।

আমি নড়লাম না।

শ্বাস আটকে গেল।

ফোনে শেষ মেসেজ—

এবার তুমি একা না।”


খাটে কেউ বসলে স্প্রিংয়ের যে পরিচিত আর্তনাদ হয়, 

সেই শব্দটা আমার কানের খুব কাছে এসে বাজল। 

আমি পাথর হয়ে বসে আছি। 

পেছনে ঘোরার সাহস নেই, 

আবার এভাবে কতক্ষণ বসে থাকা সম্ভব তাও জানি না। 

আমার ঘরের লাইটটা হঠাৎ 

ভোল্টেজ কমে যাওয়ার মতো টিমটিম করতে লাগল।

ফোনের স্ক্রিনটা তখনো জ্বলে আছে। 

সেখানে নীরার সেই শেষ মেসেজ— "এবার তুমি একা না।"

আমি কাঁপা কাঁপা হাতে টাইপ করলাম— 

"তুমি আমার থেকে কী চাও? 

আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি।"

রিপ্লাই এল তৎক্ষণাৎ:

"ক্ষতি? তুমি তো আমার উপকার করেছ। ওই ৩১২ নম্বর কেবিনটা খুব ছোট ছিল... ওখানে দেয়ালগুলো আমায় চেপে ধরত। কিন্তু তোমার এই ঘরটা... এখানে অনেক জায়গা। অনেক গল্প আছে।"

আমি এবার মরিয়া হয়ে পেছনে ঘুরলাম। 

কেউ নেই। 

কিন্তু খাটের চাদরে একটা স্পষ্ট ভাঁজ পড়ে আছে, 

ঠিক যেন কেউ বসে থাকার পর উঠে গেলে যেমনটা হয়। 

আর ঠিক সেই জায়গায় চাদরটা অসম্ভব ঠান্ডা।


(চলবে…) চতুর্থ পর্ব পড়ার জন্য ক্লিক করুন



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন