নীরা : অদৃশ্য হাহাকার
সিজন ১ | এপিসোড ১ |
একা শহর এবং একটি নিষিদ্ধ মেসেজ
ঢাকায় আসার আগে আমি কখনো বুঝিনি, একটা শহর মানুষকে এত সহজে গিলে ফেলতে পারে।
না, শব্দ দিয়ে না।
বরং শব্দের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে।
দিনের বেলা শহরটা স্বাভাবিক।
অফিস টাইমে রাস্তা ভর্তি মানুষ,
বাসের ধাক্কাধাক্কি,
রিকশার ঘণ্টা, হর্ন,
চায়ের দোকানে ভিড়
সবকিছু মিলিয়ে একটা চলমান বিশৃঙ্খলা।
কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে।
তুমি চাইলে পুরো দিন
কারো সাথে একটা কথাও না বলে কাটিয়ে দিতে পারো।
কেউ খেয়ালও করবে না।
আমি পুরান ঢাকার একটা পুরোনো বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় থাকতাম।
বিল্ডিংটা বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না—ভেতরে ঢুকলেই তার বয়স টের পাওয়া যায়।
সিঁড়ির রেলিংয়ে মরিচা।
দেয়ালের রং উঠে গেছে।
কোথাও কোথাও স্যাঁতস্যাঁতে দাগ এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যেন সেগুলো বেঁচে আছে।
আমার রুমটা করিডোরের একেবারে শেষে।
শেষ রুম।
এই “শেষ” ব্যাপারটা প্রথমে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।
কিন্তু পরে…হয়েছিল।
রুমে ঢুকলেই বাম পাশে একটা খাট।
লোহার।
বসলে কেঁচ করে শব্দ করে।
ডান পাশে একটা টেবিল—পুরোনো, কোণাগুলো একটু ভাঙা।
একটা চেয়ার, যেটা পুরোপুরি সোজা দাঁড়ায় না—একটু দুলে।
আর কোণায় একটা ফ্যান।
ফ্যানটা ঘোরে, কিন্তু পুরো মসৃণভাবে না।
ঘুরতে ঘুরতে হালকা কাঁপে।
আর মাঝে মাঝে একটু থামে।
তারপর আবার ঘোরে।
যেন কেউ ওটাকে ভেতর থেকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রথম কয়েকদিন আমি এসব কিছুই গুরুত্ব দিইনি।
অফিস থেকে ফিরতাম ক্লান্ত হয়ে।
খেয়ে শুয়ে পড়তাম।
ফোন স্ক্রল করতাম।
ঘুমিয়ে যেতাম।
এটাই ছিল রুটিন।
কোনো বন্ধু না।
কোনো আড্ডা না।
কোনো কল না।
আমি নিজেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতাম।
কারণ…
থেমে গেলে একটা অদ্ভুত শূন্যতা টের পাওয়া যেত।
সেই শূন্যতাটা প্রথম স্পষ্ট হলো এক বৃষ্টির রাতে।
সেদিন অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়েছিল।
আকাশ তখন থেকেই ভারী ছিল।
বাসা ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টি শুরু হলো।
জোরে না।
ধীরে।
নিয়মিত।
জানালার গ্রিলে পানি পড়ে—
টুপ…
টুপ…
টুপ…
আমি লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে ছিলাম।
শুধু ফোনের আলো।
স্ক্রল করছি।
কিন্তু কিছুই ঠিকমতো দেখছি না।
মাথা অন্য কোথাও।
হঠাৎ—
টিং।
মেসেজ।
Unknown number.
আমি ভেবেছিলাম স্প্যাম।
তবুও খুললাম।
“তুমি কি আজ আসবে?”
আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
তারপর হালকা হেসে ফেললাম।
ভুল নম্বর।
টাইপ করলাম—
“আপনি ভুল করেছেন।”
Send
Seen
Typing…
থামল।
আবার typing…
“তুমি না এলে আমি আজও একা থাকব।”
এই লাইনটা…
এটা ঠিক “ভুল মেসেজ” মনে হলো না।
এটার ভেতরে একটা চাপা কিছু ছিল।
যেন কেউ সত্যি অপেক্ষা করছে।
আমি ফোনটা নামিয়ে রাখতে পারতাম।
ডিলিট করে দিতে পারতাম।
কিন্তু দিলাম না।
লিখলাম—
“আপনি কে?”
এইবার রিপ্লাই আসতে সময় নিল।
এক মিনিট…
দুই মিনিট…
আমি ভাবলাম আর আসবে না।
তারপর—
“আমি নীরা।”
নামটা সাধারণ।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে…
এই একটা শব্দই কথোপকথনটাকে বাস্তব করে দিল।
আমি আর কিছু লিখিনি।
চ্যাটটা খোলা রেখেই ফোনটা পাশে রেখে দিলাম।
সেই রাতে ঘুমটা স্বাভাবিক ছিল না।
বারবার মনে হচ্ছিল—
কেউ যেন আমাকে মেসেজ করবে।
আমি অপেক্ষা করছি।
কিন্তু কেন?
আমি তো তাকে চিনি না।
রাত প্রায় ২টার দিকে ঘুম ভাঙল।
কোনো শব্দে না।
নিজে থেকেই।
রুম অন্ধকার।
ফ্যান ঘুরছে।
কিন্তু শব্দটা আগের চেয়ে একটু বেশি ভারী লাগছিল।
আমি ফোনটা হাতে নিলাম।
স্ক্রিন অন করলাম।
কোনো নতুন মেসেজ নেই।
কিন্তু…
চ্যাট ওপেন করা ছিল।
শেষ লাইন
“আমি নীরা।”
আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম।
তারপর ফোনটা লক করলাম।
নিজেকে বললাম—
“ওকে।”
“একটা ভুল মেসেজ।”
“শেষ।”
কিন্তু শেষ হয়নি।
পরদিন
আমি অফিসে ছিলাম।
ব্যস্ত।
মিটিং।
কাজ।
ডেডলাইন।
বসের ঝাড়ি।
পুরো দিন আমি ওই মেসেজের কথা ভাবিনি।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম।
জুতা খুললাম।
ব্যাগ রাখলাম।
হাত-মুখ ধুলাম।
সবকিছু রুটিন মতো।
তারপর বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিলাম।
নতুন মেসেজ।
একই নম্বর।
“আজ কি একটু দেরি হবে?”
আমার বুকের ভেতর হালকা একটা চাপ অনুভব করলাম।
আমি রিপ্লাই দিলাম না।
কিছুক্ষণ পর—
আরেকটা মেসেজ।
“তুমি ব্যস্ত থাকলে সমস্যা নেই…”
“আমি অপেক্ষা করতে পারি।”
এই “অপেক্ষা” শব্দটা আবার।
আমি বুঝলাম—
এই কথোপকথনটা আমি বন্ধ না করলে এটা চলতেই থাকবে।
কিন্তু…
আমি বন্ধ করলাম না।
কারণ খুব সোজা—
কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
এটা অনেকদিন পর নতুন কিছু ছিল।
ধীরে জড়িয়ে পড়া
পরের কয়েকদিনে একটা প্যাটার্ন তৈরি হলো।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেসেজ।
একই সময়ের আশেপাশে।
আমি রিপ্লাই দিতাম।
সবসময় না।
কিন্তু দিতাম।
প্রথমে খুব সাধারণ কথা—
“খেয়েছ?”
“অফিস কেমন?”
“আজ বৃষ্টি হয়েছে এখানে।”
“এখানে”—শব্দটা আমার মাথায় আটকে গেল।
একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম—
“তুমি কোথায়?”
Seen।
Typing…
“তুমি যেখানে আসতে পারো না… সেখানে।”
আমি ভ্রু কুঁচকালাম।
“মানে?”
কোনো রিপ্লাই নেই।
এরপর থেকে আমি খেয়াল করা শুরু করলাম—
ও কখনো সরাসরি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
আমি জিজ্ঞেস করি—
“তুমি একা থাকো?”
ও বলে—
“রাতে খুব চুপচাপ থাকে এখানে।”
আমি জিজ্ঞেস করি—
“তোমার বাসা কোথায়?”
ও বলে—
“জানালার বাইরে আলো কম।”
যেন…
সে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে না।
বরং অন্য কিছু বলছে।
সূক্ষ্ম অস্বস্তি
একদিন অফিসে আমার খুব খারাপ দিন গেল।
কাজে ভুল।
বস রেগে গেল।
পুরো দিন মাথা ভারী।
বাসায় ফিরে আমি কারো সাথে কথা বলতে চাইনি।
ফোন সাইলেন্ট করে রাখলাম।
রাত ৯টার দিকে ফোনটা আনলক করলাম।
৫টা মেসেজ।
সব একই নম্বর থেকে।
“আজ খুব চুপচাপ তুমি।”
“সব ঠিক আছে?”
“বস কি রাগ করেছে?”
“আমি কিছু ভুল বলেছি?”
আজকে তোমার দিনটা খারাপ গেছে তাই না?
শেষ মেসেজ—
“তুমি কথা না বললে… এখানে আরও ঠান্ডা লাগে।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
আমি তো তাকে বলিনি আজ আমার খারাপ দিন গেছে।
তাহলে সে বুঝল কীভাবে?
একাকিত্বের শহর
সেই রাতেই আমি প্রথমবার সরাসরি লিখলাম—
“তুমি কি একা?”
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
আমি অপেক্ষা করলাম।
৫ মিনিট…
১০ মিনিট…
১৫ মিনিট…
তারপর—
“হ্যাঁ।”
একটু বিরতি।
তারপর আরেকটা মেসেজ—
“সবসময়।”
এই “সবসময়” শব্দটা…
এটা স্বাভাবিক না।
কেউ সবসময় একা থাকে না।
কিন্তু সে বলল—
যেন এটা সত্যি।
অপেক্ষার শুরু
এরপর একটা জিনিস বদলে গেল।
আগে সে আমার জন্য অপেক্ষা করত।
এখন আমি তার জন্য অপেক্ষা করি।
অফিস থেকে ফিরেই—
ফোন।
মেসেজ এসেছে?
Seen?
Typing?
আমি নিজেই খেয়াল করলাম—
আমি বদলে যাচ্ছি।
একদিন আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম—
“আমি এটা কেন করছি?”
কোনো উত্তর পেলাম না।
কিন্তু থামলামও না।
দেখা করার প্রস্তাব
দিন যত যাচ্ছিল,
নীরা নামের সেই সত্তাটি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছিল।
আজ হাসপাতালে খুব ঠান্ডা…
আমার জানালার পর্দাটা বারবার নড়ছে।” “আজ কেউ দেখতে আসেনি আমাকে। সবাই কি আমায় ভুলে গেল?”
সে তার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলত না।
শুধু ছোট ছোট কিছু অদ্ভুত মেসেজ পাঠাত।
এই মেসেজগুলো পড়ে আমার বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম ব্যাথা অনুভব করতাম।
আমি নিশ্চিত হলাম,
নীরা কোনো হাসপাতালে আছে এবং সে হয়তো খুব অসুস্থ।
আমার একাকীত্ব আর তার নিঃসঙ্গতা এক সুতোয় গেঁথে গেল।
অবশেষে—
এক রাতে আমি লিখলাম—
“চলো দেখা করি।”
Send
Seen
তারপর
কিছুই না।
সেই রাতটা অদ্ভুতভাবে লম্বা ছিল।
ঘড়ির কাঁটা যেন ধীরে চলছিল।
১০টা…
১১টা…
১২টা…
আমি প্রায় ধরে নিয়েছিলাম, সে আর রিপ্লাই দেবে না।
তারপর—
টিং।
“তুমি কি আজ হাসপাতালে আসবে?”
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হাসপাতাল?
আমার মাথার ভেতর অনেকগুলো চিন্তা একসাথে ঘুরতে লাগল—
সে অসুস্থ?
সে সত্যি মানুষ?
আমি কি যাচ্ছি?
যাওয়া উচিত?
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
ফোনটা হাতে নিলাম।
আর কোনো মেসেজ নেই।
শুধু ওই একটা লাইন আমার চোখের সামনে -
“তুমি কি আজ হাসপাতালে আসবে?”
আমি জানি না কেন…
কিন্তু আমি বের হয়ে পড়লাম।
এ যেন এক উদ্দেশ্যহীন যাত্রা, আমি ঠিক জানিও না কোথায় যাচ্ছি
চলবে....দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...
