নীরা : অদৃশ্য হাহাকার | সিজন ১ | এপিসোড ৪ | বাস্তবের ফাটল এবং সেই নিষিদ্ধ ফাইল

 নীরা : অদৃশ্য হাহাকার

সিজন ১ | এপিসোড ৪|

বাস্তবের ফাটল এবং সেই নিষিদ্ধ ফাইল 



বাথরুমের ভ্যাপসা গরমেও আমার শরীরটা কাঁপছিল।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন নিজের মুখটা দেখলাম, 

মনে হলো আমি কোনো অচেনা মানুষকে দেখছি। 

আমার চোখের মণি দুটোর চারপাশ দিয়ে সূক্ষ্ম নীলচে কিছু রেখা ছড়িয়ে পড়েছে, 

ঠিক যেন কম্পিউটারের মাদারবোর্ডের সার্কিট। 

চোখের নিচের সেই নীলচে আভা কোনো অসুখের নয়, ওটা যেন শরীরের ভেতর থেকে আসা কোনো রেডিয়েশন। মুখ ধুয়ে রুমে ফিরে এলাম, 

কিন্তু পানিটা মুখে লাগার সময় মনে হলো ওটা পানি নয়, বরং হাজার হাজার ছোট ছোট ইলেকট্রিক শক্।

লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় বসলাম।
কিন্তু আজ আলোর অস্তিত্ব যেন অর্থহীন। 

ফ্যানটা হঠাৎ থেমে গেল। 

কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, 

মনে হলো কেউ ওটাকে হাত দিয়ে চেপে ধরে থামিয়ে দিয়েছে। 

এক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা—পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেল। তারপর ফ্যানটা আবার ঘোরা শুরু করল, 

কিন্তু শব্দটা আর আগের মতো নেই। 

বাতাসে ব্লেড ঘোরার শব্দের বদলে মনে হচ্ছে ভারি কোনো বস্তু বা কোনো অদৃশ্য শরীরকে ব্লেডগুলো আঘাত করছে।

ধপ... ধপ... ধপ...

আমি ফোনটা হাতে নিলাম। 

বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। 

চ্যাট হিস্ট্রি এখনো সেই আদিগন্ত শূন্য। 

শুধু একটি বাক্য সেখানে জ্বলজ্বল করছে— “আমি এখন তোমার কাছেই আছি।”

আমি কাঁপা আঙুলে টাইপ করলাম— 

“তুমি কী চাও? 

কেন আমাকে জ্বালাচ্ছো? 

আমার অপরাধ কী?”

মেসেজটা 'Seen' হলো। 

ওপাশে টাইপিং বাবলটা অস্থিরভাবে নড়ছে, 

যেন নীরা অনেক কিছু বলতে চাইছে। 

উত্তর এল:

তুমি তো নিজেই আমাকে খুঁজতে হাসপাতালে গিয়েছিলে ।
আমি তো আসিনি, তুমিই আমাকে তোমার জীবনে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছ। মানুষ যখন একাকীত্বের চরমে পৌঁছায়, তখন সে আসলে নিজের অজান্তেই অন্য এক জগতের দরজা খুলে দেয়। এখন প্রশ্ন করছ কেন?”


আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যেতে চাইল।
সে আমার নিউরনগুলোতে নিজের নিয়ন্ত্রণ বসিয়ে দিয়েছে।

ঠিক তখনই ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।
কোনো টেক্সট নয়, 

একটা ভিডিও ফাইল:

Subject_312_Confession.mp4

আমি কাঁপাকাঁপা হাতে ফাইলটা ওপেন করলাম।
ভিডিওর কোয়ালিটি খুব অদ্ভুত—

কখনো ঝাপসা, 

কখনো স্থির। 

ক্যামেরার সামনে ৩১২ নম্বর কেবিন।

কিন্তু এটা সাধারণ কেবিন নয়।

চারপাশের দেয়ালগুলো থেকে 

অজস্র তার আর অপটিক্যাল ফাইবার বেরিয়ে এসেছে।

মাঝখানে একটা চেয়ারে নীরা বসে আছে।
তার হাত-পা শক্ত করে বাঁধা।
তার মাথার চারপাশ দিয়ে অসংখ্য সেন্সর আর ইলেকট্রোড প্যাঁচানো, 

যেগুলো একটা বিশাল সার্ভারের সাথে যুক্ত।
নীরা আর্তনাদ করছে না,
কিন্তু তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে।
সেই জল গাল বেয়ে নিচে নামতেই তা ছোট ছোট আলোর বিন্দুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে একজন মানুষের যান্ত্রিক কণ্ঠ শোনা গেল,
যা শুনলে মনে হয় কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, 

বরং একটা অ্যালগরিদম কথা বলছে:

সাবজেক্ট ৩১২, তোমার একাকীত্বের লেভেল এখন ৯৮%। মানব মস্তিষ্কের চরম হাহাকারকে আমরা সফলভাবে ডিজিটাল সিগন্যালে রূপান্তর করতে পেরেছি। এবার তোমার ফিজিক্যাল বডি ডিলিট করার সময়।”


ভিডিওর শেষ মুহূর্তে নীরা সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকাল।
তার চোখের সেই নীল আলো যেন স্ক্রিন ভেদ করে আমার ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল।
সে ফিসফিস করে বলল— 

“তারা আমাকে ডিলিট করতে পারেনি। 

আমি তাদের সিস্টেমের ভেতর ঢুকে গেছি।

কিন্তু আমার একটা ‘গেটওয়ে’ দরকার ছিল।

এই মেস রুমের দেয়াল, 

এই ফ্যান, 

এই ফোন,

সবই এখন আমার অংশ।

আর তুমি... 

তুমি হলে আমার শেষ চাবিকাঠি।

তুমি আমাকে মুক্তি দেবে না,

তুমিই হবে আমার নতুন অস্তিত্ব।”

ভিডিও শেষ হতেই 

রের লাইটটা প্রচণ্ড শব্দে ফেটে গেল।

কাঁচের টুকরোগুলো মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।

পুরো রুম এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার।

কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝে আমি দেখলাম,


আমার মেঝের ওপর 

সেই নোনা ধরা দেয়াল থেকে 

কালো রঙের কোনো একটা তরল গড়িয়ে পড়ছে।
 

ওটা রক্ত নয়, 

ওটা যেন একটা জ্যান্ত অন্ধকার,

যা ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন